রাজধানী ঢাকার আশুলিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিজের জীবিত স্বামী আল আমিনকে (২২) মৃত দেখিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরকারী কুলসুম বেগম (২১) ও তার দুই সহযোগীকে আটক করেছে পুলিশ।
শুক্রবার (২২ নভেম্বর) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু বকর।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজারের আলেকজাহান এসএম পাড়ার মোস্তাক আহমেদের বাড়ি থেকে তাদের আটক করে রাতেই আশুলিয়া থানায় নিয়ে আসেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক রকিবুল ইসলাম।
আটকরা হলেন- মামলার কারিগর মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় থানার টেপড়া গ্রামের মেছের আলীর ছেলে রুহুল আমিন, একই জেলার ঘিওর থানার ফুলহারা গ্রামের মৃত মাসুম আলীর ছেলে শফিকুর রহমান ও ঘিওর থানার স্বল্পসিংজুরি বাঙলা এলাকার আব্দুল খালেকের মেয়ে কুলসুম বেগম।
মামলার বাদী কুলসুম বেগম বলেন, চার বছরের সন্তানকে নিয়ে স্বামী আল-আমিনের সঙ্গে শ্বশুর বাড়ি সিলেটে থাকতেন তিনি। গত ২৮ আগস্ট দাম্পত্য কলহের জেরে সিলেট থেকে সাভারে বোনের কাছে চলে আসেন কুলসুম। আসার পথে গাড়িতে শফিকুর রহমানের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং তিনি চাকরির জন্য সাভারে এসেছেন বলে জানান। এই সুযোগে শফিক কুলসুমকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রুহুল আমিনের কাছে নিয়ে যায়।
পরে রুহুল আমিন ও শফিকুর চাকরির জন্য জন্ম নিবন্ধন চেয়ে সাভারের সেনা শপিং কমপ্লেক্সে দেখা করেন। এসময় তারা জন্ম নিবন্ধন দিয়ে আমার স্বামীকে মৃত দেখিয়ে মামলা প্রস্তত করেছে বলে আমাকে জানায়। আমি রাজি না হলে তারা নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে আমাকে আদালতে নিয়ে উকিলের সামনে কাগজে স্বাক্ষর নেয়। রুহুল আমিন ও শফিকুর রহমান ব্ল্যাকমেইল করে মামলা করতে বাধ্য করেছে এবং আমাকে কক্সবাজারে বাসা ভাড়া করে দিয়ে থাকতে বলে।
বাদী কুলসুমের বোন ফাতেমা বলেন, আমার বোনকে রুহুল আমিন নানাভাবে ভয় দেখিয়েছেন। তিনি মামলা, ফাঁসি এমনকি সবসময় রুহুলের কাছে পিস্তল থাকে বলে ভয়ভীতি দেখান। রুহুল আমিন বেশ কয়েকজনের নাম মামলা থেকে কেটে দিয়েছেন। সে সময় আমার ছোটবোনকে আদালতে নিয়ে যায় তারা। তারা বলতো যে অজ্ঞাত ছেলেটা মারা গেছে সে যেন বিচার পায়, সেজন্য এই মামলা দায়ের করেছেন।
পরে বুঝতে পারি তারা একটি চক্র ও মামলা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। আমার বোন আশুলিয়া কিংবা সাভারে থাকতো না। সে থাকতো সিলেটে। শফিক ও রুহুল আমার বোনকে ফাঁসিয়েছে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শফিকুর রহমান বলেন, কুলসুমের সঙ্গে আমার গাড়িতে পরিচয় হয়। পরে তাকে নিয়ে আমি রুহুল আমিনের কাছে যাই। তিনি মামলার সব কাজ করেছেন।
অপর অভিযুক্ত রুহুল আমিন বলেন, কুলসুমই আমার কাছে মামলা করার জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন। টাকার বিনিময়ে আসামির নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে রুহুল জানায়, মনোয়ার মাস্টার, বাশার, ইলিয়াস শাহী ও সারোয়ার তালুকদারের নাম মামলা থেকে বাতিলের জন্য এভিডেভিট করা হয়েছে। তবে তাদের কাছে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি।
আশুলিয়া থানার পরিদর্শক আবু বকর বলেন, জীবিত স্বামীকে মৃত দেখিয়ে ছাত্র-জনতা হত্যা মামলা দায়েরের ঘটনায় শফিক, রুহুল আমিন ও কুলসুমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা মিথ্যা মামলার বিষয়টি স্বীকার করেছে। শনিবার মামলার বাদী কুলসুমকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদানের জন্য আদালতে পাঠানো হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৪ অক্টোবর কুলসুম বেগম তার জীবিত স্বামী আল আমিনকে হত্যার অভিযোগ এনে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন।
তিনি এজাহারে উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিল চলাকালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের গুলিতে তার স্বামী মো. আল আমিন মিয়া (৩৪) নিহত হয়েছেন। এ ব্যাপারে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩০ জনকে আসামি করা হয়। পরে এটি ৮ নভেম্বর ঢাকার আশুলিয়া থানায় এজাহারভুক্ত হয়। পরে এ সকল তথ্য গনমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানা থেকে আল আমিনকে উদ্ধার করে।