রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ন

যেভাবে কয়েক মাস হরমুজ প্রণালি অচল রাখতে পারে ইরান

আমার দেশ / ৭৩ জন পড়েছে
প্রকাশ: রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ন

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ড্রোন হামলা চালিয়ে কয়েক মাস ধরে অচল করে রাখার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দারা এমন কথাই বলছেন।

তবে যেভাবে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরান, তা আর কতদিন তারা চালিয়ে যেতে পারবে, সেটি এখনও স্পষ্ট নয়।

গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পাল্টা জবাবে ইরান এ পর্যন্ত উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি নিশানা করে এক হাজারের বেশি ড্রোন এবং কয়েকশ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

যদিও এর বেশিরভাগই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বংস করা হয়েছে, তবুও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে ৬টি জাহাজে হামলার পর বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ড্রোনের বিশাল উৎপাদন

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তহবিলে চলা অলাভজনক গবেষণা সংগঠন ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্স’ (সিআইআর) জানিয়েছে, ইরানের প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন তৈরির সক্ষমতা আছে। ড্রোন প্রস্তুতকারক দেশগুলির মধ্যে বিশ্বের প্রথম সারিতে রয়েছে ইরান।

তবে ইরানের কাছে কত ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর অনুমান, তেহরানের কাছে ২,৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। আর অন্য বিশ্লেষকদের হিসাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৬০০০।

সংঘাত কত দিন চলতে পারে, বা এর গতিপথ কেমন থাকবে তা অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে ইরানের অস্ত্রভান্ডারের ওপরে।

ইরান এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি প্রায় অবরুদ্ধ করে রেখেছে। ইরান এবং ওমানের মাঝের এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ দিয়ে কোনও জাহাজ যাওয়ার চেষ্টা করলেই তাতে হামলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে ইরান।

বেশ কিছু জাহাজে ইতিমধ্যে হামলা হয়েছেও। হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যেও। জ্বালানির দাম বাড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাজারে। অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি ইরানের জন্য একটি দুর্বল জায়গা বলে মনে করেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআইসিক্স এর সাবেক পরিচালক।

তার মতে, ইউক্রেইনের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে আসা রাশিয়া ইরানকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার মতো অবস্থায় নেই। আর চীন ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করতে চাইলে এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থাকবে।

চীন ইরানকে কোনও ধরনের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে সেটি যদি জানাজানি হয়ে যায়, তাহলে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোর সঙ্গে তা সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে।

পশ্চিমা আরেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, কৌশলগত সুবিধার জন্য বন্ধু গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করে থাকতে পারে ইরান।

লেবাননের হিজবুল্লাহ গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করায় ইরানের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কিছুটা কমে থাকতে পারে।

তাছাড়া, গতবছর জুন মাসে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের ফলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ কিছুটা কমেছিল।

যদিও ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, ওই ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি ইতিমধ্যেই বেশ কিছুটা পূরণ করে নিয়েছে ইরান।

তবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে ইরানের প্রতিবন্ধকতা হতে পারে উৎক্ষেপণকেন্দ্র (লঞ্চার)-এর অভাব। গত বছর সংঘর্ষে বেশ কিছু লঞ্চার ধ্বংস হয়েছে। গত শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তা আরও কমেছে বলে দাবি ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থার।

তবে এসব ধাক্কার পরও ইরান ড্রোন দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে পারে। ‘ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট’-এর সিনিয়র ফেলো ফারজিন নাদিমি জানান, ইরানের সর্বশেষ প্রজন্মের ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনগুলো ৭০০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম।

এই ড্রোনগুলো ইরানের মূল ভূখণ্ড বা জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করা হলে পারস্য এবং ওমান উপসাগরীয় অঞ্চলের যে কোনও লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম।

ইরানের ড্রোনগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম। ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬৫টি ড্রোন প্রবেশ করেছে এবং দুবাই বিমানবন্দর ও আমাজনের ডাটা সেন্টারে আঘাত হেনেছে।

বাহরাইনেও ইরানের ড্রোন হামলায় অবকাঠামোর ক্ষতিসহ একটি মার্কিন নৌ ঘাঁটি, হোটেল টাওয়ার ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সমুদ্র মাইন

ইরানের যদি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ফুরিয়েও যায়, তবে তারা সমুদ্র মাইন ব্যবহারের পথে হাঁটতে পারে। সমুদ্রপথের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা গোয়েন্দা সংস্থা ‘ড্রায়াড গ্লোবাল’-এর মতে, ইরানের কাছে ৫ থেকে ৬ হাজার মাইন রয়েছে।

সমুদ্রপথে মাইন পাতা হলে কোনও জাহাজ এর সংস্পর্শে এলেই বিস্ফোরণ ঘটবে। তবে ইরান এখনও সেপথে হাঁটেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা হয়েছে এমন কোনও আভাস এখন পর্যন্ত মেলেনি।

কনসালটেন্ট কোম্পানি কন্ট্রোল রিসক্স এর পরিচালক করম্যাক ম্যাককারি বলেন, “যদি হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিছানো হয়, তবে তা পরিষ্কার করে পথটি নিরাপদ করতে কয়েক মাস সময় লেগে যাবে। সেটিই হবে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মূল কারণ।”

চলতি সপ্তাহেই অপরিশোধিত তেলের দাম ১২ শতাংশ এবং ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট বব ম্যাকনালি বলেন, “ইরান সহজে হার মানবে না। তারা যদি মাত্র কয়েকটি ট্যাঙ্কারে আঘাত করে বিশ্বকে দেখাতে পারে যে এই পথ অনিরাপদ, তবে আতঙ্কেই জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরও খবর

Calendar

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  
https://youtube.com/@simantobangla1803
এক ক্লিকে বিভাগের খবর