‘আমার স্বামী কাতার থাকে। আমাদের এখন তাকে নিয়েই চিন্তা। প্রতিদিন মিসাইল হামলার খবর দেখি। রাতে ঘুমানোর সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করি, সকালে উঠে যেন স্বামীর সঙ্গে কথা বলতে পারি। তিনি যেন নিরাপদে থাকেন’। কথাগুলো কাতার প্রবাসী সুজন আহমেদের স্ত্রী ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের বাসিন্দা সুইটি আক্তার পিংকির। আর কাতারের আবু নাখলা এলাকার একটি লেবার ক্যাম্পে বসবাস করা সুজন আহমেদ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে কথা বলার সময়ও শোনাচ্ছিলেন হুইসেলের শব্দ। কথা শেষে কিছুক্ষণ পরে ভয়েস ম্যাসেজে জানিয়েছেন, আল উদেইদ আমেরিকান এয়ার বেসের কাছে একটি ওই মিসাইল আঘাত হেনেছে। বলেন, এমন মিসাইলের ভয় নিয়ে আমরা এখানে আছি। জানি না কী আছে ভাগ্যে।
শুধু সুজন বা তার স্ত্রী সুইটি আক্তার নয়, এখন একই রকম আতঙ্ক-উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা প্রায় সব প্রবাসী ও তাদের পরিবার। পরদেশে প্রবাসীরা যেমন মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে অবস্থান করছেন। তেমনি দেশে স্বজনরা সারাক্ষণ দূর প্রবাসে থাকা স্বামী, সন্তান, বাবা বা ভাইকে নিয়ে আতঙ্কে দিনপার করছেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে। তারা ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্থাপনা’ নিশানা করে হামলা চালাচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েল ছাড়াও লেবানন, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও সাইপ্রাসে হামলা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আশপাশের দেশগুলোতেও, অর্থাৎ প্রায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
এসব দেশে বসবাস করা প্রবাসীরা জানিয়েছেন, যুদ্ধ বা হামলার আতঙ্কের কারণে যাদের স্থায়ী কাজ নেই, তারা এক প্রকার বেকার হয়ে আছেন। কোম্পানিগুলো কাজে নিয়ে গেলেও হামলার সতর্কতা সংকেত (হুইসেল) বেজে উঠলে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনেক প্রবাসী জানান, তারা দেশে ফিরতে চাইলেও ফ্লাইট বন্ধ থাকায় ফিরতে পারছেন না। ভারত সরকার তাদের নাগরিকদের ফেরত নিতে বিশেষ ব্যবস্থা করলেও বাংলাদেশ সরকার এখনো পর্যন্ত তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কাতার থেকে সুজন আহমেদ গতকাল টেলিফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি থাকি কাতারের আল উদেইদ আমেরিকান এয়ার বেসের কাছে একটি লেবার ক্যাম্পে। মাঝে মাঝেই এখানে মিসাইল হামলা হয়। হামলার আগে আগে মেবাইলে বেজে ওঠে সতর্কতা সংকেত (হুইসেল)। যখন হুইসেল বাজে, তখন বুঝতে পারি না কী করব, রুমে থাকব, না বেরিয়ে যাব। অনেক সময় বাইরে গেলে দেখি মাথার ওপর দিয়ে মিসাইল উড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রবিবারও আমাদের ক্যাম্পের কাছাকাছি একটি মিসাইল বিস্ফোরিত হয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয় মিসাইল আমাদের ওপরেই পড়বে। দেশে ফিরতে চান কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ফিরতে চাইলেও কোনো উপায় দেখছি না। তিনি বলেন, কাতারে ভারতের যেসব শ্রমিকরা রয়েছে, তাদের ফেরত নিতে সে দেশের সরকার বিশেষ ব্যবস্থা করেছে। সড়ক পথে সৌদি আরব নিয়ে সেখান থেকে বিশেষ ফ্লাইটে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের নাগরিকদের। তবে আমাদের সরকার এখনো ওইরকম কোনো ব্যবস্থা করেছে বলে শুনিনি। অ্যাম্বাসি থেকেও এমন কোনো তথ্য পাইনি। সুজনের স্ত্রী সুইটি আক্তার পিংকি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ছেলে চিন্তার আমার শ^াশুরি অসুস্থ হয়ে গেছে। সারাদিন টিভির সামনে বসে খবর দেখে। রমজান চলছে, সামনে ঈদ। তবে আমাদের পরিবারে কোনো আনন্দ নেই। শুধু আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করছি। আমার স্বামী যেন নিরাপদে থাকে, আল্লাহর কাছে শুধু এটাই প্রার্থনা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে থাকা জাহিদুল ইসলাম রিহানের বাবা মুন্সিগঞ্জের লিটন ঢালী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ছেলেটাকে নিয়ে খুব চিন্তা হয়। সবার কছে শুনি, টিভিতে দেখি বোমা হামলা হয়। মিসাইল হামলা হয়। এর মধ্যে আমার ছেলে কাজ করে ওখানে। তিনি বলেন, যদিও ছেলে বলে চিন্তা না করতে, তবে বাবা হিসেবে আমি চিন্তা না করে কীভাবে থাকি। আল্লাহর কাছে চাই ছেলে যেন আমার নিরাপদে থাকে।
সৌদি আরবের আল-খার্জ এলাকায় বসবাস করা আরমান খান টেলিফোনে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, রবিবার যেখনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একজন বাংলাদেশিসহ দুজন নিহত হয়েছে, সেখান থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে থাকেন তিনি। আরমান জানান, হামলার সময় বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আমিও কেঁপে উঠি। জানি না এই যুদ্ধ এমনভাবে চলতে থাকলে কতদিন নিরাপদে থাকতে পারব। রাজধানীর শনিরআখড়া এলাকায় বসবাস করা আরমান খানের স্ত্রী লিজা আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমার স্বামীকে নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। তিনি বলেন, টাকার জন্য বিদেশে গেছেন আমার স্বামী। আমরা এখন টাকা পয়সা কিছুই চাই না। চাই শুধু আমার স্বামী নিরাপদে থাকুক।