ভাষা শহীদদের রক্তে গড়া ইতিহাসের প্রতীক উখিয়া শহীদ মিনার। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে এই পবিত্র স্মৃতিস্তানটি পরিণত হচ্ছে অবাধ আড্ডাখানায়। প্রতিদিন বিকেল হলেই শহীদ মিনারের বেদিতে জুতা পায়ে উঠে বসা, হাঁটাহাঁটি করা এবং পার্কের মতো ব্যবহার করার ঘটনা স্থানীয় সচেতন মহলকে গভীরভাবে ব্যথিত করছে।
স্থানীয়রা জানান, দিনের শেষ প্রান্তে এসে শহীদ মিনার এলাকায় মানুষের ভিড় বাড়ে। কিন্তু সেই ভিড় কোনো শ্রদ্ধা নিবেদন বা স্মরণ অনুষ্ঠানের জন্য নয়-বরং গল্প-আড্ডা, পরিবার নিয়ে সময় কাটানো ও অবাধ চলাচলের উদ্দেশ্যে। অনেককেই দেখা যায় জুতা পায়ে শহীদ মিনারের মূল বেদিতে উঠে বসতে, যা শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
বিশেষ করে গত শনিবার শহীদ ওসমান হাদির আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া মাহফিল ও নিরবতা পালনের সময় বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। ওইদিন দেখা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত কয়েকজন ব্যক্তি পরিবার ও শিশুদের নিয়ে শহীদ মিনারে অবস্থান করেন। একপর্যায়ে তারা জুতা পায়ে বেদিতে উঠে হাঁটাহাঁটি ও আড্ডায় মেতে ওঠেন।
এ সময় স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মী তাদের বাধা দিলে ওই ব্যক্তি বলেন, “আমরা প্রতিদিনই এখানে উঠি, কেউ কখনো বাধা দেয় না। আজ আপনারা বলছেন কেন?” অভিযোগ রয়েছে, সচেতন করার পরও তিনি সংবাদকর্মীদের প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তবে একই সময়ে অন্য পাশে বসে থাকা আরেক এনজিওকর্মী ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে জুতা খুলে নেন।
এদিকে শহীদ মিনারটি সংস্কারের পর একসময় সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকলেও বর্তমানে তদারকির অভাবে চরম অবহেলার শিকার।
জানা গেছে, শহীদ মিনারের চারপাশে দেওয়া লোহার সিকল (বেষ্টনী) কে বা কারা খুলে নিয়ে গেছে, অথচ এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে একটি সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদল ব্যক্তিগত কাজে স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি জানান, বিষয়টি তার নজরে থাকলেও এ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। তিনি আরও বলেন, “কে বাধা দেবে? কিছুদিন আগে লোহার সিকলগুলোও নিয়ে গেছে, তাও জানা নেই। আপনারা এই বিষয়গুলো একটু লিখুন।”
এ বিষয়ে কয়েকজন এনজিও কর্মী তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, উখিয়া উপজেলা ছুটির দিন হোক বা কর্মদিবস-সবসময়ই জনবহুল থাকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে বাইরে থেকে আসা এনজিও কর্মীর সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। কিন্তু শিশুদের খেলাধুলা কিংবা সকাল-বিকেল শরীরচর্চার জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত ও নির্ধারিত কোনো জায়গা নেই বলেও তারা দাবি করেন।
তাদের ভাষ্যমতে, “পার্ক বা খেলার মাঠ না থাকায় অনেক সময় পরিবার ও শিশুদের নিয়ে খোলা জায়গা হিসেবে শহীদ মিনার এলাকায় আসতে হয়। আমরা এখানে সময় কাটাতে আসি, শহীদদের অবমাননা করার কোনো উদ্দেশ্য আমাদের নেই।”
তবে সচেতন মহলের দাবি, সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকলেও শহীদ মিনারের মতো পবিত্র ও ঐতিহাসিক স্থানে জুতা পায়ে ওঠা কিংবা আড্ডা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তারা মনে করেন, অবিলম্বে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, স্থায়ী পাহারা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে শহীদ মিনারের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি রক্ষায় এখনই প্রয়োজন প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ। অন্যথায় ইতিহাসের প্রতি এই অবমাননা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে-যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।