শুক্র. ফেব্রু. ২৮, ২০২০

পেঁয়াজ নিয়ে হতবাক ক্রেতার সামনে এখন চালের আক্রা বাজার

দ্ইু মাস ধরে পেঁয়াজের মূল্য মানুষকে এমনই ধোঁকা দিয়েছে যে, ঘুরে ঘুরে এখন হয়রান ক্রেতা। এই নিত্যপণ্যটির অতিমূল্য নিয়ে আর হা-হুতাশ নেই তাদের মধ্যে। অনেকটা অতি শোকে পাথর যেন। দোকানে গিয়ে এখন আর কেউ পেঁয়াজের কেজি কত জিজ্ঞেস করেন না। কোনো ধরনের দামদরও করেন না।  ম্লান মুখে বরং বলেন, তিনটা পেঁয়াজ দাও। এরপর বিক্রেতার চাহিদামতো দাম দিয়ে চলে আসেন ক্রেতা।

যে পেঁয়াজ মাস দুয়েক আগে ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেটি যখন হঠাৎ ৬০-৭০ টাকা উঠে গেল, তখন বেশ হাহাকার দেখা গেছে বাজারে। এরপর দু-তিন দিনের ব্যবধানে ১০০, ১৫০ টাকার রেকর্ড ছাড়ালে সরকারি মহল নড়েচড়ে বসে। সেই দামও নিচে পড়ে যায় দ্রুতই। পেঁয়াজের কেজি উঠে যায় ২৮০-৩০০ টাকায়। তখন কি আর শোক করা চলে!

সরকারের বিমানে পেঁয়াজ আনার উদ্যোগে কিছুটা আশা জেগেছিল ক্রেতার মনে। ২৮০ থেকে দাম নেমেছিল ১৮০-২০০ টাকায়। কিন্তু বিদেশ থেকে পেঁয়াজ উড়ে আসার পর কেজি আবার ২৫০ টাকায় উঠলে আশার হাল ছাড়ল ক্রেতা।

পেঁয়াজ নিয়ে হতবাক ক্রেতার সামনে এখন চালের আক্রা বাজার। কদিন আগে রকমভেদে চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা। তারও নামার খবর নেই। বিক্রেতারা বলছেন, সামনে নতুন ধান উঠলে দাম কমে যাবে।

কিন্তু ক্রেতারা তাতে আশ^স্ত হন না। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসেছেন হাতিরপুলের হাবিবুর রহমান। বলেন, ‘প্লেনে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ এসেছে, কিন্তু দাম তো কমছে না। এখন পাইকারি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা করে, খুচরায় ২৫০। আর চালের দাম যে কেজিতে ৬-৭ টাকা বেড়েছিল সেটা এখনো কমেনি।

পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে দায় আমদানিকারক ও পাইকাররা। চালের মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী কারা? ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল থেকে বেড়েছে চালের দাম।

কারওয়ান বাজারের মেসার্স নোয়াখালী রাইস ট্রেডার্সের মালিক নুর করিম ঢাকা টাইমসের কাছে দাবি করেন,  সপ্তাহ খানেক আগে চিকন চাল কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৮ টাকা বেড়েছে। আর মোটা চাল বেড়েছে দেড় টাকা। এ বাড়তি দামেই এখন বিক্রি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে চালের বাজার স্থিতিশীল আছে।

কবে চালের দাম কমতে পারে এমন প্রশ্নে নুরু করিম বলেন, ‘আমরা যে আড়ত থেকে চাল আনি তারা বলে, মিলে দাম বেশি। তাই তারা দাম বাড়িয়েছে। আমরা বেশি দামে কিনছি, সে অনুযায়ী বিক্রি করছি। নতুন চাল না আসা পর্যন্ত দাম কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ।’

কারওয়ান বাজারে ঘুরে কয়েকজন পাইকারি চাল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেও মূল্যবৃদ্ধির একই তথ্য জানা গেছে। তারা বলছেন, প্রতি ৫০ কেজি মিনিকেট চালের বস্তায় ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

চলতি নভেম্বর মাসের শুরুর দিকে মিল পর্যায়ে সরু চালের দাম বাড়তে শুরু করে। রশিদ, মোজাম্মেলসহ প্রায় সব কটি মিলে মিনিকেট চাল প্রতি কেজিতে ৪ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়।

চালের দামের সাম্প্রতিক বৃদ্ধির ব্যাখ্যা দিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী সাধন মজুমদার। বরিবার সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, ‘সরু চালের দাম কম বলে অনেকে মোটা চাল ছেড়ে তা খাচ্ছেন, সেই কারণে খুচরা বাজারে সরু চালের দাম খানিকটা বেড়েছে। মোটা চাল আর মানুষ খায় না, সবাই সরু চাল খায়। ধানের দাম কমে যাওয়ার ফলে চালের দাম কমে গেছে, তাই সরু চালে অভ্যস্ত হয়ে গেছে মানুষ।’

পেঁয়াজে কৃচ্ছ্রসাধন

দাম নিয়ে টানা দুই মাসের অস্থিরতায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সাধারণ ক্রেতারা পেঁয়াজ কেনায় লাগাম দিয়েছেন। আগে যেখানে সপ্তাহে চাহিদার দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতেন, এখন তিনিই বাজার থেকে কিনছেন হাতে গোনা কয়েকটি পেঁয়াজ।

কারওয়ান বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা করে, আর মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকা, চায়নার পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি।

রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে অনেক মুদি দোকানি পেঁয়াজ বিক্রি করছেন না। বাজার ঘুরে  দেখা যায় আগে যে পরিমাণ পেঁয়াজ বিক্রি হতো, এখন সেই পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে না।

বেসরকারি চাকরিজীবী হামিদ রহমান এসেছেন পেঁয়াজ কিনতে। কয়েকটা দোকান ঘুরে একটিতে পেলেন। বলেন, ‘বাসায় খুব ঝামেলা হচ্ছে। মেয়ে বলছে নুডুলছেও ঠিকমতো পেঁয়াজ দেও না। কী করব বলেন, একটা ডিমের দাম ১০ টাকা, কিন্তু দুটি পেঁয়াজের দাম ৩০ টাকা। তাই পেঁয়াজ কম ব্যবহার করছি।’

রাজধানীর হাতিরপুলের গৃহিণী আরিফা পারভিন তরকারি ঘন করতে অনেক সময় পেঁপেকুচি ব্যবহার করছেন। বলেন, ‘পেঁয়াজ কম দিচ্ছি তরকারিতে। আগে যে পরিমাণ পেঁয়াজ দিতাম, তার এক-তৃতীয়াংশ দিচ্ছি এখন।’

হাতিরপুল কাচাবজার ঘুরে দেখা গেছে প্রতি কেজি  দেশি পেঁয়াজ খুচরা বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকা, মিশরের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা, তুরস্কের পেঁয়াজ ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা।

শ্যামবাজারের মের্সার্স আলি ট্রেডার্সের মালিক সামসুর রহমান ঢাকা টাইমসকে বলেন, দেশি পুরনো পেঁয়াজ ২০০-২১০ টাকা আর নতুন মুড়ি কাটা পেঁয়াজ ১৪৫ টাকা, মিয়ানমারেরটা ১৭০-১৯০ টাকা। আর মিশর চায়না, তুরস্ক, পাকিস্তানের পেঁয়াজ নেই শ্যামবাজারে।

তিনি বলেন, বাজার প্রায় ফাঁকা। দুপুরের দিকে মার্কেটে তিনটি পেঁয়াজের গাড়ি ঢুকেছে।

এত পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে তবুও বাজার ফাঁকা কেন জানতে চাইলে সামসুর রহমান বলেন, ‘আসলে পেঁয়াজ আসতে তো সময় লাগছে। রবিবার এক বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী যে পেঁয়াজের কথা বলেছেন সেগুলে হয়তো আগামী সপ্তাহে আসবে। তখন দাম কিছুটা কমবে।’

বাণিজ্যমন্ত্র টিপু মুনশি রবিবার সাংবাদিকদের জানান, পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক হতে আরও ১০ দিন সময় লাগবে। জাহাজে আমদানি করা পেঁয়াজ আগামী ১০ দিনের মধ্যে বাজারে আসবে। এ ছাড়া ডিসেম্বরের প্রথমেই বাজারে দেশি নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করবে। সব মিলিয়ে আগামী ১০ দিনের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার স্বাভাবিক হবে।

– ঢাকাটাইমস/২৬নভেম্বর

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.