রবিবার, ১৪ Jul ২০২৪, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

ঝরে পড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন প্রভাষক

ঝরে পড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন প্রভাষক

উপকূলীয় এলাকায় ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক ইদ্রিস আলী। তাদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ‘স্কুল অব হিউম্যানিটি’ নামে একটি শিক্ষাদান কেন্দ্র চালু করেছেন। সেখানে শিক্ষার আলো পাচ্ছে এলাকার ঝরে পড়া শিশুরা।

সুন্দরবন উপকূলীয় উপজেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর। এখানকার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালি বাজারে প্রতি শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত শিক্ষা দেয়া হয় এসব শিশুকে। ইতোমধ্যে এলাকায় বেশ সাড়াও ফেলেছে স্কুলটি। কোনো ঘর নেই স্কুলটির। পাতাখালি বাজারের একটি পরিত্যাক্ত চান্নিতে ছুটির দিনে পাঠদান করা হয়।

পাতাখালি বাজারে চায়ের দোকানদার সারাফাত হোসেন, কয়েক বছর আগে গাছ থেকে পড়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। তার সাত বছরের ছেলে তাসফিরুল ইসলাম এ স্কুলটির নিয়মিত শিক্ষার্থী।

সারাফাত হোসেন বলেন, আমরা গরীব, ছেলেকে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পাড়িয়েছি। কিন্তু গাছ থেকে পড়ে আমি পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর ছেলের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে পরিবারে অভাব, অন্যদিকে চায়ের দোকান পরিচালনা কষ্টসাধ্য। সেজন্য ছেলে চায়ের দোকানে আমার সঙ্গে সহযোগিতা করে।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে দুই মাস আগে হিউম্যানিটি স্কুলের যুবকদের অনুরোধে ছেলেকে সেখানে ভর্তি করে দিয়েছি। প্রতি শুক্রবার বিকেলে সে ওই স্কুলে যায়। সেখানে খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা দেয়া হয়। ছেলেটাও শুক্রবার আসলেই স্কুলে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আমার মতো এলাকার অনেক গরীব পরিবারের ঝরে পড়া শিশু সেখানে পড়ছে।

প্রভাষক ইদ্রিস আলী জানান, নানা কারণে উপকূলীয় এলাকার শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে তারা বেড়ে বেড়ে ওঠে। অভাব-অনটনসহ বাবা-মায়ের পারিবারিক সমস্যার কারণেও শিশুরা স্কুল থেকে ঝরে যায়। এসব শিশুর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানোসহ আবারও তাদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনাই তাদের উদ্দেশ্য। আর যেসব শিশুর বিদ্যালয়ে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই তাদের মৌলিক শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, গত দুই মাস আগে এ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাতাখালি বাজারের পরিত্যাক্ত চান্নিতে প্রতি শুক্রবার বিকেলে পাঠদান করা হয়। বর্তমানে এলাকার ৩০ জন ঝরে পড়া শিশুকে সেখানে পাঠদান করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ মানবিক কারণেই বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছি। শুক্রবার বিকেলে এসব শিশুরা ছাড়াও আশেপাশের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও উপস্থিত হয় এখানে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, পাতাখালি মাদরাসার ইংরেজি শিক্ষক ইয়াছিন আলী, স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জিএম মাহমুদুন্নবী ও প্রবাসী আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে উপদেষ্টা করে স্কুলটি পরিচালনা করা হচ্ছে।

প্রভাষক ইদ্রিস আলী আরও জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স উপযোগী শিক্ষামূলক আকর্ষণীয় ভিডিও দেখানো, এর মাধ্যমে ক্লাসে মনোযোগী ও পরবর্তীতে স্কুলের প্রতি আকৃষ্ট করা, খেলাধুলা ও ধাঁধার মাধ্যমে তাদেরকে গণিত বিষয়ের মৌলিক ধারণা দেয়া, গান, কৌতুক ও অভিনয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগী ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা, পাশাপাশি ছবিযুক্ত ছোটগল্পের বই পড়তে উৎসাহিত করা, ক্লাস শেষে ১০ মিনিটের একটি খেলা বা অন্য কোনো জ্ঞানমূলক প্রতিযোগিতা করে পুরস্কার দেয়া এছাড়া ক্লাস শেষে রয়েছে খাবারের ব্যবস্থা। ঝরে পড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে এভাবেই পরিচালনা করা হচ্ছে স্কুলটি। স্কুলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ঝরে পড়া অথবা অর্থাভাবে স্কুলের চৌকাঠ না মাড়ানো শিশুদের বিনোদনের মাধ্যমে বিকল্প পদ্ধতিতে শিক্ষা দেয়া। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি করে তাদেরকে আবার মূলধারার স্কুলে ফেরত পাঠানো। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও সুন্দরবন রক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে তৎপর করা। এসবের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন উপকূলবর্তী অঞ্চলের ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে তাদের জীবনকে পরিবর্তন করা।

স্কুলটির বিষয়ে পদ্মপুকুর ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে মানুষ। আইলা, সিডর, ফনি, বুলবুল এসব দুর্যোগের কারণে মানুষ দিশেহারা। এলাকার অধিকাংশ মানুষ গরীব ও নিম্ন আয়ের। অভাবের তাড়নায় ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন না। জীবিকার তাগিদে একটু বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যে কোনো কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। হিউম্যানিটি স্কুলটি শুরুর মধ্য দিয়ে এলাকার বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুরা নতুন করে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানে ৩০ জন ঝরে পড়া শিশুকে একত্রিত করে পাঠদান করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এর সংখ্যা আরও বাড়বে। এমন বিদ্যালয়ের প্রয়োজন ছিলেআরও আগেই।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম কামরুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, স্কুলটির বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। তবে উপকূলীয় এলাকায় ঝরে পড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানোর বিষয়টি প্রশংসনীয়।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসন স্কুলটির বিষয়ে খোঁজ নেবে। এছাড়া সরকারিভাবে সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে কিনা সেটি বিবেচনা করা হবে।

পোষ্টটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© কপিরাইট ২০১০ - ২০২৪ সীমান্ত বাংলা >> এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ

Design & Developed by Ecare Solutions