মঙ্গল. অক্টো. ২২, ২০১৯

অনলাইনভিত্তিক ক্যাসিনোর মূল হোতা সেলিম প্রধান। ঢাকার অপরাধ জগতের ডন তিনি। পশুর খাটালে চাঁদাবাজি, হোটেল, স্পা, ক্যাসিনো পরিচালনাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর সময় বিমান থেকে নামিয়ে আনা হয় তাকে।

সেলিম প্রধান গ্রেফতার হওয়ার পর তার অপরাধ সম্পর্কে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশের অনলাইনের মাধ্যমে ক্যাসিনো ব্যবসা চালাতেন সেলিম। অনলাইনে কয়েন বিক্রি করে এই ক্যাসিনো চালানো হতো। এসব করে কামিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।

সেলিম প্রধান ঋণ খেলাপি। সূত্র বলছে, সেলিম প্রধান রূপালী ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকা লোন নিয়েছেন। তার বাবার নাম হান্নান প্রধান। ঢাকার মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে তার বাসা। তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে।

সেলিম প্রধান অনলাইনে ক্যাসিনো পরিচালনাকারী এবং বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রধান। তিনি ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সহসভাপতি। এ ছাড়া এর আগে গ্রেফতার হওয়া বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার ক্যাশিয়ারও।

সেলিম প্রধানের ব্যাংককের পাতায়ায় বিলাসবহুল হোটেল, ডিসকো বারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

থাইল্যান্ডের পাতায়াতেও রয়েছে তার ক্যাসিনো ব্যবসা। সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্পা ও বিউটি পার্লার যেখানে ভিআইপিদের আসা-যাওয়া রয়েছে, সেগুলোতে নারী সরবরাহের কাজ করতেন সেলিম। সেই মেয়েরা ভিআইপিদের বিনোদন দেয়ার কাজ করতেন। সিলেট থেকে অবৈধভাবে পাথর নিষ্কাশনের কাজ করতেন তিনি।

সেলিমের প্রধানগ্রুপ ডট কম নামের একটি ওয়েবসাইট রয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়ছে, সেলিম প্রধানের লাইভ ক্যাসিনো মার্কেট পি২৪ লিমিটেড নামের গেমিং কোম্পানি ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওয়েবসাইটে দেয়া ঠিকানায় দেখা যায়, গুলশান-২ এর ৯৯ নম্বর রোডের ১১/এ নম্বরে রয়েছে ‘পি২৪’ এর অফিস। করপোরেট অফিসের ঠিকানা দেয়া হয়েছে, ডি-১ মমতাজ ভিশন, গুলশান-২ এর ৯৯ নম্বর রোডে ১১/এ। বিদেশের অফিসের ঠিকানা হচ্ছে, ১৬৫/৯৬ মো ১০, সুরাসাক, শ্রী রাখা, চনবুন, থাইল্যান্ড, ২০১১০।

সেলিমের ক্যাসিনো ব্যবসা সম্পর্কে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারওয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, অনলাইনে কয়েন বিক্রি করে ক্যাসিনো খেলায় জুয়াড়িদের উদ্বুদ্ধ করতেন সেলিম প্রধান। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খুলেছিলেন তার গোপন ক্যাসিনো। ক্যাসিনো থেকে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি বিভিন্নভাবে বিদেশে পাচার করেছেন।

গত রাতে সেলিম প্রধানের অফিসে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব-১। গুলশান-২ এর ৯৯ নম্বর সড়কের ১১/এ নম্বর ভবনে রাত ১০টার দিকে এ অভিযান শুরু হয়। এই ভবনেই সেলিম পি ২৪ গ্যাম্বলিং নামে অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা করতেন। এই অফিস থেকে বিপুল বিদেশি মদ ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়।

অনলাইন ক্যাসিনো থেকে আয়ের অর্থ সেলিম জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করতেন। গুলশানে তার একটি স্পা সেন্টার রয়েছে। সেখানেও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনাই নয়, সেলিম প্রধান রাজশাহীসহ সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় গবাদিপশুর সব খাটাল ও মাদক সিন্ডিকেটের হোতা। এমনকি সীমান্তে জালটাকার মূল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে।

প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে তিনি খাটাল, মাদক ও জালটাকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা নেন। দুই বছরে তিনি সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনাই নয়, সেলিম প্রধান রাজশাহীসহ সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় গবাদিপশুর সব খাটাল ও মাদক সিন্ডিকেটের হোতা। এমনকি সীমান্তে জালটাকার মূল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে।

প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে তিনি খাটাল, মাদক ও জালটাকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা নেন। দুই বছরে তিনি সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছেন।

সেলিমের গুলশানের স্পা সেন্টারে প্রশাসনের এক কর্মকর্তার যাতায়াত ছিল। পরে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি দুই বছর ধরে সীমান্তের খাটাল, মাদক ও জাল টাকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁসহ দেশের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয় গবাদিপশু থেকে রাজস্ব আদায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ২২টি খাটাল আছে।

বিজিবি এসব খাটালের ব্যবস্থাপনা করে থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক খাটাল মালিক জানান, তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে খাটালের অনুমোদন পেলেও সেলিম প্রধানকে টাকা না দিলে গবাদিপশু রাখার অনুমতি পাওয়া যায় না।

প্রতিটি খাটাল থেকে সেলিম প্রধান ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত এককালীন টাকা নিয়েছেন। এরপরও খাটালে গবাদিপশু এলে প্রতিটিতে তাকে ৩ হাজার টাকা করে দিতে হতো। এজন্য খাটাল মালিকরা সেলিম প্রধানের নামে আলাদা করে টাকা তুলতে বাধ্য হয়েছেন। এভাবে তিনি গত দুই বছরে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সীমান্ত থেকে ২০ কোটি টাকার বেশি চাঁদা নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

সর্বশেষ খবর