করোনার ধকল শেষে কক্সবাজারে মারাত্মক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুরপ্রকোপ মৃত্যু-২।

SIMANTO SIMANTO

BANGLA

প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২২

হেলথ ডেস্ক নিউজ ;

কক্সবাজার জেলায় মারাত্মক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর রোগের প্রকোপ। প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে এ রোগে নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। ঘরে ঘরে চলছে জ্বর শর্দি কাশি, গলা ব্যথা। ভয়ে অনেকেই পরীক্ষা না করিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ভাবছে ভালো হয়ে যাবে, আবার যারা পরীক্ষা করাচ্ছে তাদের কারো ধরা পড়ছে করোনা, কারো বা ডেঙ্গু। তবে ক্রমানুপাতিকহারে ডেঙ্গুর প্রকোপই ইদানিংকালে বেশি দেখা যাচ্ছে। হাসপাতাল, ফার্মেসী, ডায়গনষ্টিক সেন্টারে গেলেই দেখা মিলছে ডেঙ্গু রোগের।
এক কথায় করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ডেঙ্গু কক্সবাজার বাসীর মনে নতুন মাথা ব্যথার কারন হয়ে ডাড়িয়েছে। আর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অবস্থা তো আরো খারাপ।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আশিকুর রহমানের মতে , প্রায় দেড় মাস আগে থেকে সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী আসছে। প্রতিদিন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। সর্বশেষ শনিবার পর্যন্ত সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই রোগে এক রোহিঙ্গাসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া সর্বশেষ হাসপাতালে ভর্তি ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা রয়েছে।

বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। কক্সবাজার জেলায় এডিস মশাবাহিত এ রোগের প্রকোপ এখন অন্যান্য এলাকার তুলনায় বেশি। বিশেষ করে এ জেলাটি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকা হওয়াতে অতিরিক্ত জনসাধারণ, অপরিচ্ছন্ন জীবন যাপন, যেখানে সেখানে পানি জমে থাকা থেকে মশার বিস্তার বাড়ছে। আর এর থেকেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও কক্সবাজার সদরে ডেঙ্গু রোগীর প্রকোপ বেড়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, ঢাকার পর কক্সবাজার জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ এপর্যন্ত বেশি দেখা যাচ্ছে। এ বছর জানুয়ারি থেকে শনিবার ১৭ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজার জেলা সরকারি হাসপাতালে ৯৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে দুইজন। আর সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১২ জন। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালেও কিছু রোগি চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারে এই বছর ডেঙ্গু রোগের প্রকোপটা রোহিঙ্গা ক্যাম্প কেন্দ্রিক শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই ডেঙ্গু রোগি বেশি শনাক্ত হয়েছে। ক্যাম্পে রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে স্থানীয় চাকুরীজীবি সহ প্রতিদিন কেউ না কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে। উখিয়ার টেকনাফের স্থানীয়দের মাঝে ও ভেঙ্গু ছড়াচ্ছে। ক্রমান্বয়ে জেলার অন্যান্য উপজেলায় ছড়িয়েছে ডেঙ্গু।

প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এতে চলতি মাসে এই আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ইতিমধ্যে মৃত্যু হয়েছে এক কন্যা শিশুর। কক্সবাজারস্থ শরণার্থী প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ে স্বাস্থ্য সমন্বয়কারি ডা. তোহা ভূঁইয়া নুর এর কাছে জুন মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত যে তথ্য রয়েছে সেখানে ১ হাজার ৮২১ জন রোহিঙ্গা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। তার দেয়া তথ্য মতে, জানুয়ারি মাসে ১৮৪ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ৯ জন, মার্চে ১৭ জন, এপ্রিলে ৫৭ জন, মে মাসে ২৩৩ জন রোহিঙ্গা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। চলতি জুন মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩২১ জন রোহিঙ্গা। ১৯ জুন থেকে এ রোগে আক্রান্তের কোন তথ্য কক্সবাজারস্থ শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ে না থাকলেও তা অন্তত ৪ শত হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য সমন্বয়কারি ডা. তোহা ভূঁইয়া।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ মোমিনুর রহমান সর্ব মোট ৮৯ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বলে জানান। গত বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ২৫ জন ভর্তি রয়েছে। যার মধ্যে ১১ জন রোহিঙ্গা বলে জানান তিনি।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা আশিকুর রহমান জানান, গত ২৩ জুন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত জিসমা (8) নামের রোহিঙ্গা এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জিসমা কুতুপালং ৩ নম্বর ক্যাম্পের ডি ১৬ ব্লকের করিম উল্লাহর মেয়ে। করিম উল্লাহ জানান, তার মেয়েকে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ওখানে রক্ত বমি করে মেয়ে মারা যান। কক্সবাজারস্থ শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের স্বাস্থ্য সমন্বয়কারি ডা. তোহা ভূঁইয়া নিজেও এখন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বলে জানা গেছে।

এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রতিটি ঘরে ৮ থেকে ১০ জন গাদাগাদি করে থাকে। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় সেখানে মশা জন্মানোর সুযোগ বেশি। এ কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের ঝুঁকি ও বেশি। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে সচেতনতারও অভাব রয়েছে । এখন সচেতনতা বাড়াতে প্রচার চালানো হচ্ছে, ব্যবস্থা করা হয়েছে দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষার। এ ছাড়া যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেগুলো নষ্ট করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
এছাড়াও কক্সবাজার শহরে চলমান সড়ক ও ড্রেইন সংস্কার কাজে দীর্ঘ সূত্রিতায় বিভিন্ন স্থানে পানিবদ্ধতা এডিস মশার বংশ বিস্তারের কারণ বলে মনে করেন স্বাস্থ্য কর্মীরা।

ডেঙ্গু হলে করনীয়ঃ

ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে প্লাটিলেট সামান্য কমলেও সাধারণত এক লাখের বেশি থাকে। সাধারণ ডেঙ্গু জ্বর আর ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের মধ্যে পার্থক্য আছে। শুধু জ্বর বা রক্তক্ষরণ হলেই সেটা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বলতে হলে প্লাটিলেট এক লাখের নিচে থাকতে হবে। সেই সঙ্গে রক্তের হিমাটক্রিট ২০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ থাকতে হবে। সঙ্গে থাকতে পারে রক্তনালি থেকে রক্তরস বেরিয়ে আসা বা প্লাজমা লিকিংয়ের সমস্যা (যেমন প্রোটিন কমে যাওয়া, পেটে–বুকে পানি জমা) থাকবে। বিশ্বে প্রতিবছর ১০ থেকে ৪০ কোটি লোকের ডেঙ্গু হয়, এর মধ্যে খুব কমসংখ্যকের হেমোরেজিক ডেঙ্গু হয়ে থাকে।

ডেঙ্গু জ্বর হলে রক্তের সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) পরীক্ষা করার মাধ্যমে প্লাটিলেটের সংখ্যা নিরূপণ করা হয়। প্লাটিলেটের সংখ্যা এক লাখের কম হলে তাকে হেমোরেজিক বলে ধরে নেওয়া যায়।

আসলে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় প্লাটিলেট পরীক্ষার ভূমিকা শুধু হেমোরেজিক কি না, তা ডায়াগনসিসের জন্যই। ৮৯ থেকে ৯০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর প্লাটিলেট কমে বটে, তবে এদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশের জটিল পর্যায়ের নিচে যায়। মোটে ৫ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীর মারাত্মক রক্তক্ষরণ জটিলতা হয় আর রক্ত পরিসঞ্চালন দরকার হতে পারে। প্লাটিলেটের সংখ্যা ২০ হাজারের নিচে নামলে রক্তক্ষরণের আশঙ্কা থাকে। প্লাটিলেট যদি ৫ হাজারের কম হয়, তখন মস্তিষ্ক, কিডনি, হৃৎপিণ্ডের মধ্য রক্তক্ষরণের ভয় থাকে।

ডেঙ্গু হলে অনেকে সকাল-বিকেল প্লাটিলেট পরীক্ষার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন বা প্লাটিলেট একটু কমতে থাকলেই আতঙ্কিত হতে থাকেন। এর কোনোই দরকার নেই। বারবার পরীক্ষা করালে দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ বাড়া ছাড়া আর কোনো উপকার হয় না। আবার মেশিনে গুনলে এই সংখ্যা ভুল হতে পারে, কারণ প্লাটিলেট ক্লাম্প বা গুচ্ছ হিসাবে থাকায় মেশিন অনেকগুলোকে একটা হিসেবে ধরে সংখ্যা নিরূপণ করে।

মূলত ডেঙ্গুতে গুরুতর রক্তক্ষরণ হলে, যেমন মলের সঙ্গে রক্তপাত বা রক্তবমি হলে রক্তের বদলে রক্ত দেওয়াই উত্তম, প্লাটিলেট নয়। তা ছাড়া প্লাটিলেট সঞ্চালন খুবই ব্যয়সাধ্য ও শ্রমসাধ্য ব্যাপার, এক ইউনিটের জন্য চারজন দাতাকে রক্ত দিতে হয়। সর্বত্র প্লাটিলেট পৃথক করার যন্ত্রও নেই।

সব মিলিয়ে ডেঙ্গু হলে প্লাটিলেট কমা ও প্লাটিলেট জোগাড় নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা ও ছোটাছুটি করবেন না। সাধারণ ডেঙ্গু হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন, যথেষ্ট তরল খাবার খান। প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে স্যালাইন নিন। ডেঙ্গু জ্বরের এর বাইরে আর তেমন কোনো চিকিৎসা নেই, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আপনা–আপনি সেরে যায়।