সোম. মার্চ ২৫, ২০১৯

পৃথিবীর তাবৎ ধর্ম ও সমাজে নিজ নিজ সংস্কৃতি ও অবকাঠামো অবয়বে উদযাপিত উৎসবে মানবিক মূল্যবোধের সৃজনশীল প্রেরণার, সখ্য সৌহার্দ্য প্রকাশের অভিষেক ঘটে থাকে। নানা উপায় উপলক্ষে সম্প্রীতি বোধের বিকাশলাভ ঘটে থাকে, অবনিবনার পরিবর্তে বন্ধন, মতপার্থক্যের অবসানে সমঝোতার পরিবেশ সৃজিত হয়

ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েই মানুষের জীবন অর্থবহ হয়ে ওঠে। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষের আচার আচরণ প্রবৃত্তি প্রবণতার ওপর একটা গঠনমূলক নিয়ন্ত্রণ নির্দেশ করে। মূলত ধর্মীয় বিধিবিধান আচার অনুষ্ঠান মানুষের আত্মিক উন্নতি লাভের পথনির্দেশ করে, আর এই আত্মগত উন্নতির ওপর ভিত্তি করে সমষ্টিগত তথা সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়ে থাকে। অপরের কল্যাণ সাধনই সব সমাজ দর্শনের মূল ভিত্তি। ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ এই মহান ব্রত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সবার জন্য সুখময় জীবনযাপন নিশ্চিত হয়। ব্যষ্টি থেকে সমষ্টি। ব্যক্তি কল্যাণের ওপরই রচিত হয় সমষ্টিগত কল্যাণের সৌধ। পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নয়ন, একে অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ এবং অপরের আনন্দ বেদনায় পরস্পরকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে সামাজিক সংহতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সামাজিক সংহতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সামাজিক মূল্যবোধ, যা অভিন্ন সত্তা হিসেবে কাজ করে। এই মূল্যবোধ সহসা কিংবা আরোপিত নির্দেশের বলে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান ও ব্যবহারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা স্থিতি আকারে প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ লাভ করে থাকে। এক্ষেত্রে ধর্ম এক বিরাট গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে থাকে।

ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ধর্মের মূল আদর্শগুলো প্রতিফলিত হয়ে থাকে। অপরের কল্যাণে নিবেদিত হতে উৎসাহিত করাই ধর্মীয় উৎসবগুলোর মূল লক্ষ্য। মানুষমাত্রই সামাজিক জীব। সে নিজে একা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে জীবনযাপন করতে পারে না। কোনো না কোনো কারণে তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তাকে বহির্মুখী করে তোলে। অন্যের সঙ্গে নানা লেনদেনে তাকে সম্পৃক্ত হতে হয়। ফলে সবার সঙ্গে তার একটা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলাকে লক্ষ্য করে গঠনমূলক শিক্ষা, প্রত্যয় ও প্রতীতি ধর্মীয় উৎসবগুলোতে বাস্তবায়িত হয়। উৎসব এবং অনুষ্ঠানমাত্রই একটি সম্মিলন। সমাজের সব স্তরের মানুষ বিশেষ উপলক্ষে একত্র হয়। ব্যক্তি হয় সমষ্টির অংশ। ফলে ভাবের আদান প্রদান হয়। সুখ-দুঃখের কথোপকথন হয়। আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগির একটা তাগিদ অনুভূত হয়। এমন ধরনের সম্মেলনের মাধ্যমে ব্যক্তির সুখ-দুঃখ, সমস্যা সবার সুখ-দুঃখ সমস্যায় রূপান্তরিত হয়ে থাকে। একের দুঃখ অন্যের সুখের সঙ্গে, একের বেদনা অন্যের আনন্দের সঙ্গে, একের অভাব অন্যের প্রাচুর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে সমাধানের পথ খুঁজে পায়।

ধর্মীয় উৎসবগুলো সাধারণত বছরের বিশেষ সময়ে ও উপলক্ষে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে সবার সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ আসেÑ সংবৎসরের জমে থাকা দঃখ-বেদনা-মনোমালিন্য দূর করার একটা উপলক্ষ তাতে মিলে। ধর্মীয় উৎসবগুলো প্রায়ই কৃচ্ছ্র সাধন, আত্মত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের প্রেক্ষপটে আনন্দের ও ত্যাগের হেতু হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। আত্মকল্যাণ লাভের জন্য কঠোর ত্যাগ, সাধনা ও পরিশ্রমের পর আনন্দের সোপান হিসেবে এ উৎসবের আয়োজন। সে উৎসবে থাকে পরিতৃপ্তির আমেজ। আত্মোৎসর্গের পরিতৃপ্তিতেই অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা জাগে। সেজন্য ধর্মীয় উৎসবগুলোতে দানখয়রাত করা অর্থাৎ বিত্তবান সমর্থরা বিত্তহীন অসমর্থদের সাহায্য করে, আনন্দে সবাই সমভাবে অংশগ্রহণ করে। অন্যের অতৃপ্তিকে নিজের অতৃপ্তি বলে মনে করে সবাই। খোদার সন্তুষ্টির জন্য বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে আহার্য দ্রব্য, সম্পদ-সামগ্রী, এমনকি জীবজন্তু উৎসর্গ করা হয়ে থাকে এ উৎসবগুলোতে। উৎসর্গীকৃত এসব সম্পদ-সামগ্রী জীবজন্তুর কোনো কিছুই বিধাতার দরবারে সরাসরি পৌঁছায় না। উৎসর্গকারীর পক্ষ থেকে নিবেদিত নিষ্ঠা ও সকৃতজ্ঞতা প্রকাশের ইচ্ছাটিই প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়ে থাকে।

ÔNo one should suppose that meat or blood is acceptable to the One True God. It was a Pagan fancy that Allah could be appeased by blood sacrifice. But Allah does accept the offering of our hearts, and as a symbol of such offer, some visible institution is necessary. …our symbolic act finds practical expression in benevolence and that is the virtue sought to be taught… we should proclaim the true doctrine, so that virtue and charity may increase among men. (আল কোরআন : সূরা হজ, ৩৭নং আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইউসুফ আলী)।

এই ধূলির ধরায় উৎসর্গীকৃত সবকিছুই করা হয় সবার মাঝে, যা কিছু উৎসর্গ করা হয়, তা সবই আহার্য কিংবা মানুষের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, যা অন্যের ক্ষুধা ও অভাব মিটিয়ে থাকে। সুতরাং দেখা যায়, ধর্মীয় উৎসবের সবকিছুই সামাজিকতার আদর্শ প্রতিফলনের মধ্যেই সার্থকতা লাভ করে থাকে।

সাম্য ও সামাজিক সংহতির ধর্ম ইসলামের ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আশুরা, শবেবরাত, শবেকদর বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য। এসব উৎসবের মূল তাৎপর্য হলো আত্মশুদ্ধি ও আত্মোৎসর্গের কঠোর ত্যাগ সাধনার প্রেক্ষাপটে আনন্দঘন সম্মিলন। গরিব-দুঃখীদের মধ্যে দানখয়রাত করা, ভেদাভেদ ভুলে সবার সঙ্গে এ সম্মিলনে শরিক হওয়া, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি, কোরবানীকৃত পশুর গোশত বিলিবণ্টনের মাধ্যমে সামাজিকতার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে থাকে। মোবারক মাস রমজানের পর আসে ঈদুল ফিতর। সুদীর্ঘ এক মাস কঠোর কৃচ্ছ্র সাধনের পর আসে আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর। ‘ঈদ’ শব্দের ব্যবহারিক অর্থ খুশি। আভিধানিক অর্থ ‘ফিরে আসা’। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে যে বিশেষ নিয়মকানুন পালিত হয়, তা থেকে ‘স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসা’ হয় ঈদুল ফিতরের দিনে। ঈদের এ আনন্দ উৎসবে শরিক হওয়ার সামর্থ্য সবার সমানভাবে থাকে না। সেজন্য ইসলামে সমাজের ধনী ও বিত্তবান সদস্যদের ওপর দরিদ্র ও বিত্তহীনদের মধ্যে জাকাত ও ফিতরা প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছেÑ ‘বিত্তবানদের সম্পদের ওপর বিত্তহীনদের হক আছে।’ (সূরা জারিয়াত : ১৯)। কোরআনের এই অমোঘ নির্দেশ ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে জাকাত ও সদকা প্রদানের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে থাকে। বিধান রয়েছে, ঈদের নামাজ আদায়ের আগেই জাকাত ও ফিতরা প্রদান করতে হবে। এটা ঈদুল ফিতরের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তাৎপর্য। উন্মুক্ত ময়দানে ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু, সাদা-কালোর সব ভেদাভেদ ভুলে ঈদের জামাতে শামিল হওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্মিলনে পাড়াপড়শি থেকে শুরু করে সব পরিচিত-অপরিচিতের সঙ্গে একত্রিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। নামাজ শেষে কোলাকুলির মাধ্যমে সবাই সব ভেদাভেদ ও মনোমালিন্য ভুলতে চেষ্টা করে। ঈদের দিনে সবাই সাধ্যমতো নতুন পোশাক পরিধান করে। পুরানো বিবাদ বিসংবাদ দুঃখকষ্ট থেকে নতুনতর জীবনবোধ ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রতীকী প্রকাশ ঘটে থাকে এর মধ্যে। একে অন্যের বাসায় পালাক্রমে দাওয়াত খাওয়া যাতায়াতের মাধ্যমে সামাজিক সখ্যের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়।

ঈদুল আজহা উদযাপনের মধ্যেও নিশ্চিতভাবে রয়েছে আত্মশুদ্ধির সুযোগসহ বিশেষ সামাজিক তাৎপর্য। ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক পুত্র ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার মহান স্মৃতিকে স্মরণ করে পালিত হয় ঈদুল আজহা। ইতিহাসের ধারাবাহিতায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানির মাধ্যমে আত্মোৎসর্গের পরিচয় দেওয়া হয়। এই পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে নিজের পাশব প্রবৃত্তি, অসৎ উদ্দেশ্য ও হীনম্মন্যতাকেই কোরবানি করা হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ বিশেষ ঈদ উৎসবে নিজের চরিত্র ও কুপ্রবৃত্তিকে সংশোধন করার সুযোগ আসে। জীবজন্ত উৎসর্গ করাকে নিছক জীবের জীবনসংহার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আত্মশুদ্ধি ও নিজের পাশব প্রবৃত্তিকে অবদমন প্রয়াস প্রচেষ্টার প্রতীকী প্রকাশ।

সুত্র- দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.